জলপাই আচার রেসিপি — সারা বছর সংরক্ষণের উপায়সহ
শীতের সকালে রোদে বসে ভাত খাওয়ার সময় পাশে যদি এক চামচ জলপাই আচার থাকে, তাহলে সাধারণ ভাত-ডালের স্বাদও যেন হঠাৎ বদলে যায়। টক-ঝাল-মিষ্টি সেই গন্ধ, সরিষার তেলের ঝাঁজ আর মসলার সুবাস — এক চামচ আচার মুখে দিলেই মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা, দাদি-নানির হাতের আচারের কথা। অনেকেই জানতে চান, ঘরে বসে দোকানের মতো সুস্বাদু জলপাই আচার কীভাবে বানানো যায়, আর কীভাবে সেটা সারা বছর ভালো রাখা যায়।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জলপাই আচার বানানোর সম্পূর্ণ গাইড দেবো। এখানে আপনি জানতে পারবেন জলপাই আচারের জন্য কী কী উপকরণ লাগবে, জলপাই কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, কোন মসলা কতটুকু দিতে হয়, সরিষার তেলে আচার বানানোর সঠিক নিয়ম, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — আচার সারা বছর ভালো রাখার গোপন উপায়। চলুন, তাহলে শুরু করা যাক।
নিচের যে অংশ থেকে পড়তে চান, ক্লিক করুন
- জলপাই আচার কেমন স্বাদের হয়?
- জলপাই আচার বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?
- জলপাই আচারের মসলা কীভাবে তৈরি করবেন?
- জলপাই কীভাবে প্রস্তুত করবেন?
- ধাপে ধাপে জলপাই আচার বানানোর নিয়ম
- জলপাই আচার সারা বছর ভালো রাখার উপায়
- জলপাই আচার কীভাবে খাবেন ও পরিবেশন করবেন?
- জলপাই আচারের বিশেষ টিপস
- আমাদের শেষ কথা
- জলপাই আচারের বিভিন্ন রকম
- জলপাই আচার বানানোর সময় সাধারণ ভুল
জলপাই আচার কেমন স্বাদের হয়?
জলপাই আচার হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় আচারগুলোর একটি। টক জলপাইয়ের সঙ্গে ঝাল মসলা, সরিষার তেল আর সামান্য মিষ্টির মিশেলে তৈরি এই আচার ভাত, খিচুড়ি, পরোটা — সবকিছুর সঙ্গেই দারুণ মানিয়ে যায়। শীতকালে যখন বাজারে তাজা জলপাই পাওয়া যায়, তখনই আচার বানানোর সবচেয়ে ভালো সময়। কারণ এই সময়ের জলপাই হয় মোটা, রসালো আর টক-স্বাদের দিক থেকে একদম পারফেক্ট।
অনেকেই মনে করেন আচার বানানো খুব কঠিন কাজ। কিন্তু সত্যি বলতে, সঠিক উপকরণ আর নিয়ম জানা থাকলে যে কেউ ঘরে বসে দোকানের চেয়েও ভালো আচার বানাতে পারবেন। আর ঘরে বানানো আচারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে কোনো ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ বা রং থাকে না। আপনি নিজের হাতে পরিষ্কার উপকরণ দিয়ে বানাচ্ছেন, তাই স্বাদ আর স্বাস্থ্য — দুটোই নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যায়।
জলপাই আচার শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টির দিক থেকেও বেশ ভালো। জলপাইয়ে আছে ভিটামিন সি, আয়রন আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তবে মনে রাখবেন, আচারে তেল আর লবণের পরিমাণ বেশি থাকে, তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। এক-দুই চামচ আচার ভাতের সঙ্গে খেলে স্বাদও পাবেন, আবার শরীরের ক্ষতিও হবে না।
জলপাই আচার বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?
জলপাই আচার বানাতে খুব বেশি উপকরণ লাগে না। বাজারে সহজেই যা পাওয়া যায়, তাই দিয়েই দারুণ আচার বানানো যায়। নিচে ১ কেজি জলপাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের তালিকা দেওয়া হলো।
- কাঁচা জলপাই — ১ কেজি (মোটা, শক্ত ও দাগহীন জলপাই নিন)
- সরিষার তেল — ২ কাপ (আচারের জন্য খাঁটি সরিষার তেলই সবচেয়ে ভালো)
- লবণ — ৩ টেবিল চামচ
- হলুদ গুঁড়া — ১ টেবিল চামচ
- শুকনো মরিচ — ৮-১০টি
- সরিষা বাটা — ২ টেবিল চামচ
- পাঁচফোড়ন — ১ টেবিল চামচ
- জিরা গুঁড়া — ১ চা চামচ
- ধনে গুঁড়া — ১ চা চামচ
- মেথি — ১ চা চামচ
- কালোজিরা — ১ চা চামচ
- আদা বাটা — ১ টেবিল চামচ
- রসুন বাটা — ১ টেবিল চামচ
- চিনি বা গুড় — ২-৩ টেবিল চামচ (স্বাদ অনুযায়ী)
- ভিনেগার — ২ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক, তবে সংরক্ষণে সাহায্য করে)
- তেজপাতা — ২টি
উপকরণগুলো কেনার সময় একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন — জলপাই যেন একদম তাজা হয়। নরম হয়ে যাওয়া বা পচা দাগ থাকা জলপাই দিয়ে আচার ভালো হয় না। আর সরিষার তেলের ক্ষেত্রে খাঁটি তেল ব্যবহার করাই ভালো, কারণ ভেজাল তেলে আচার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। মসলাগুলো যদি সম্ভব হয়, বাজার থেকে গুঁড়া কিনে না এনে বাড়িতে ভেজে গুঁড়া করে নিন — তাহলে গন্ধটা অনেক বেশি তাজা থাকবে।
জলপাই আচারের মসলা কীভাবে তৈরি করবেন?
আচারের আসল স্বাদ আসে মসলা থেকে। দোকানের আচারের চেয়ে ঘরের আচার বেশি সুস্বাদু হয় তার একটা বড় কারণ হলো তাজা ভাজা মসলা। মসলা তৈরির নিয়মটা জেনে নিন।
প্রথমে শুকনো কড়াইয়ে পাঁচফোড়ন, জিরা, ধনে, মেথি আর কালোজিরা আলাদা আলাদা করে হালকা করে ভেজে নিন। মসলা ভাজার সময় চুলার আঁচ কম রাখবেন, যাতে মসলা পুড়ে না যায়। মসলা থেকে সুন্দর গন্ধ বের হতে শুরু করলেই নামিয়ে নিন। তারপর ঠান্ডা করে শিল-পাটায় বা মিক্সারে মোটা করে গুঁড়া করে নিন। একদম মিহি গুঁড়া করবেন না — মোটা গুঁড়া আচারে মুখে পড়লে বেশি মজা লাগে।
শুকনো মরিচগুলোও একইভাবে হালকা ভেজে গুঁড়া করে নিতে পারেন। আর সরিষা বাটার ক্ষেত্রে সরিষা দানাগুলো ১৫-২০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে বেটে নিন। সরিষা বাটা আচারে দিলে একটা ঝাঁজ আসে, যেটা জলপাই আচারের আসল পরিচয়।
জলপাই কীভাবে প্রস্তুত করবেন?
জলপাই প্রস্তুত করাটা আচার বানানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে ভুল হলে আচার নরম হয়ে যাবে বা তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে।
প্রথমে জলপাইগুলো ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে নিন। তারপর প্রতিটা জলপাইয়ের গায়ে ছুরি দিয়ে ২-৩টি লম্বা চির দিন। চির দেওয়ার কারণে মসলা আর তেল জলপাইয়ের ভেতরে ঢুকতে পারে, ফলে আচারের স্বাদ হয় গভীর ও সমান। তবে চির দেওয়ার সময় জলপাই যেন দুই টুকরো হয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
এরপর জলপাইগুলোতে লবণ আর হলুদ মাখিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রেখে দিন। এই সময়ে জলপাই থেকে পানি বের হয়ে আসবে। সেই পানি ফেলে দিন। তারপর জলপাইগুলো ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে নিন। রোদে শুকানো জলপাই দিয়ে বানানো আচার অনেক বেশি দিন ভালো থাকে। তবে রোদ না পেলে চুলায় হালকা আঁচে ১০-১৫ মিনিট ভেজে নিলেও কাজ চলবে।
ধাপে ধাপে জলপাই আচার বানানোর নিয়ম
ধাপ ১: তেল গরম করা
প্রথমে কড়াইয়ে সরিষার তেল ঢেলে মাঝারি আঁচে গরম করুন। তেল থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে চুলা থেকে নামিয়ে একটু ঠান্ডা হতে দিন। তারপর আবার চুলায় বসান। এই নিয়মে সরিষার তেলের কাঁচা গন্ধ চলে যায়, আচারে আর তিতা ভাব থাকে না।
ধাপ ২: ফোড়ন দেওয়া
গরম তেলে তেজপাতা, পাঁচফোড়ন আর কালোজিরা ফোড়ন দিন। ফোড়ন থেকে সুন্দর গন্ধ বের হলে আদা বাটা আর রসুন বাটা দিয়ে দিন। ১-২ মিনিট নাড়াচাড়া করুন, যাতে আদা-রসুনের কাঁচা গন্ধ চলে যায়।
ধাপ ৩: জলপাই দেওয়া
এবার রোদে শুকানো জলপাইগুলো তেলে দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে ৮-১০ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। জলপাইগুলো যখন একটু নরম হয়ে আসবে আর তেলের রং বদলে যাবে, তখন বুঝবেন পরের ধাপের সময় হয়েছে।
ধাপ ৪: মসলা মেশানো
এবার ভাজা মসলার গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া, শুকনো মরিচের গুঁড়া আর সরিষা বাটা দিয়ে দিন। ভালো করে নাড়াচাড়া করুন যাতে প্রতিটা জলপাইয়ের গায়ে মসলা লাগে। ৫-৭ মিনিট ধরে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। মসলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে বুঝবেন আচার প্রায় তৈরি।
ধাপ ৫: চিনি ও ভিনেগার দেওয়া
সবশেষে চিনি বা গুড় আর ভিনেগার দিয়ে দিন। চিনি দিলে আচারের টক ভাবটা ব্যালান্স হয় আর স্বাদ হয় টক-মিষ্টি-ঝাল। ভিনেগার আচারকে অনেক দিন ভালো রাখতে সাহায্য করে। ২-৩ মিনিট নাড়াচাড়া করে চুলা থেকে নামিয়ে নিন। আচার ঠান্ডা হলে কাচের বয়ামে ভরে নিন।
আচার বানানোর পর সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া যায়, তবে ৩-৪ দিন রেখে খেলে স্বাদ আরও ভালো হয়। কারণ এই সময়ে মসলা জলপাইয়ের ভেতরে ভালোভাবে ঢুকে যায়।
জলপাই আচার সারা বছর ভালো রাখার উপায়
আচার বানানো যতটা সহজ, সেটা ভালো রাখা ততটাই জরুরি। অনেকের আচার কিছুদিন পরেই ছত্রাক ধরে বা নষ্ট হয়ে যায়। নিচের নিয়মগুলো মেনে চললে আপনার জলপাই আচার সারা বছর ভালো থাকবে।
- আচার সবসময় কাচের বয়ামে রাখুন। প্লাস্টিকের বয়ামে আচার রাখলে স্বাদ নষ্ট হয় আর দ্রুত ছত্রাক ধরে।
- বয়ামে ভরার আগে বয়ামটি ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিন। ভেজা বয়ামে আচার রাখলেই ছত্রাক ধরবে।
- আচারের ওপরে সবসময় তেলের একটা স্তর থাকতে হবে। আচার যেন কখনো তেলের নিচে না ডুবে, সেটা খেয়াল রাখুন। তেল কমে গেলে ওপরে আরও সরিষার তেল ঢেলে দিন।
- আচার তোলার সময় সবসময় শুকনো চামচ ব্যবহার করুন। ভেজা চামচ আচার নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
- বয়ামটি ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় রাখুন। রান্নাঘরের আর্দ্র জায়গায় আচার রাখবেন না।
- মাঝে মাঝে আচারের বয়ামটি রোদে দিন। ১৫-২০ দিন পর পর ১-২ ঘণ্টা রোদে দিলে আচার অনেক দিন ভালো থাকে।
- আচারে যদি কখনো সাদা ছত্রাক দেখা যায়, তাহলে ওপরের স্তরটা ফেলে দিয়ে বাকি আচার আবার তেলে ডুবিয়ে রোদে দিন।
সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে জলপাই আচার ১ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ভালো থাকে। যত দিন যাবে, আচারের স্বাদ তত গভীর হবে।
জলপাই আচার কীভাবে খাবেন ও পরিবেশন করবেন?
জলপাই আচার ভাতের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়। গরম ভাত, ডাল আর এক চামচ জলপাই আচার — এই কম্বিনেশনটা বাংলাদেশের প্রায় সব ঘরেই পরিচিত। এছাড়া খিচুড়ির সঙ্গে জলপাই আচার খেতে দারুণ লাগে, বিশেষ করে বর্ষার দিনে। পরোটা বা রুটির সঙ্গেও আচার খাওয়া যায়।
অতিথি এলে ভাতের পাশে ছোট বাটিতে করে আচার পরিবেশন করুন। আচারের সঙ্গে একটু কাঁচা পেঁয়াজ কুচি দিলে স্বাদ আরও বেড়ে যায়। আর যারা ঝাল পছন্দ করেন, তারা আচারের সঙ্গে কাঁচা মরিচ খেতে পারেন।
আরও দেখুন: মুরগির মাংসের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে পড়ুন — ১০০ গ্রাম মুরগির মাংসে কত প্রোটিন – সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬
জলপাই আচারের বিশেষ টিপস
- জলপাই কেনার সময় মাঝারি আকারের জলপাই নিন। খুব ছোট জলপাইয়ে আঁটি বেশি থাকে, আর খুব বড় জলপাই নরম হয়ে যায়।
- আচারে গুড় ব্যবহার করলে স্বাদটা আরও ঘরোয়া হয়। তবে গুড় দিলে আচারের রং একটু গাঢ় হয়ে যায়।
- যারা কম তেল খেতে চান, তারা তেলের পরিমাণ একটু কমাতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, তেল কম হলে আচার বেশিদিন ভালো থাকে না।
- আচার বানানোর সময় কড়াইয়ে যেন এক ফোঁটাও পানি না থাকে। পানি থাকলে আচার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
- বাজারের আচারের মসলা দিয়ে বানানো আচারের চেয়ে নিজে ভেজে গুঁড়া করা মসলার আচার অনেক বেশি সুগন্ধি হয়।
- আচার বানানোর পর ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করলে স্বাদ সবচেয়ে ভালো হয়। তাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন।
জলপাই আচার খাওয়ার সুবিধা
- ভাতের স্বাদ বাড়ায়, রুচি ফেরায়।
- ঘরে বানানো আচারে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে না।
- জলপাইয়ে ভিটামিন সি আর আয়রন আছে।
- সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে সারা বছর খাওয়া যায়।
জলপাই আচার খাওয়ার অসুবিধা
- তেল আর লবণ বেশি থাকে, তাই বেশি খাওয়া উচিত নয়।
- যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে, তাদের ঝাল আচার কম খাওয়াই ভালো।
- উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আচার পরিমিত পরিমাণে খাবেন।
আরো জানুন: ঈদের বিশেষ রান্নার রেসিপি দেখতে পড়ুন — ঈদে গরুর মাংস রান্নার রেসিপি ২০২৬
জলপাই আচারের বিভিন্ন রকম
জলপাই আচার শুধু এক রকমের হয় না। অঞ্চলভেদে আর স্বাদের পছন্দ অনুযায়ী জলপাই আচারের অনেক রকম আছে। নিচে জনপ্রিয় কয়েকটি রকমের কথা বলা হলো।
মিষ্টি জলপাই আচার
যারা টকের চেয়ে মিষ্টি বেশি পছন্দ করেন, তাদের জন্য মিষ্টি জলপাই আচার সবচেয়ে ভালো। এই আচারে গুড় বা চিনির পরিমাণ একটু বেশি দেওয়া হয়। ১ কেজি জলপাইয়ের জন্য ৫-৬ টেবিল চামচ গুড় দিলে আচারটা টক-মিষ্টি হয়। মিষ্টি আচারে শুকনো মরিচের পরিমাণ একটু কম দিলে বাচ্চারাও খেতে পারে। এই আচার ভাতের সঙ্গে যেমন ভালো লাগে, তেমনি পরোটার সঙ্গেও দারুণ মানিয়ে যায়।
ঝাল জলপাই আচার
ঝালপ্রেমীদের জন্য ঝাল জলপাই আচার সবচেয়ে প্রিয়। এই আচারে শুকনো মরিচের পরিমাণ বেশি দেওয়া হয়, আর কাঁচা মরিচও দেওয়া হয়। ঝাল আচার বানানোর সময় ১ কেজি জলপাইয়ের জন্য ১৫-১৬টি শুকনো মরিচ ব্যবহার করতে পারেন। ঝাল আচার খিচুড়ির সঙ্গে খেতে অসাধারণ লাগে। তবে যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে, তাদের ঝাল আচার কম খাওয়াই ভালো।
তেল ছাড়া জলপাই আচার
যারা তেল কম খেতে চান, তারা তেল ছাড়া জলপাই আচার বানাতে পারেন। এই আচারে সরিষার তেলের বদলে সামান্য পানি আর ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। তবে মনে রাখবেন, তেল ছাড়া আচার বেশিদিন ভালো থাকে না। এই আচার ১-২ মাসের মধ্যে খেয়ে ফেলতে হয়। তেল ছাড়া আচার ফ্রিজে রাখলে একটু বেশি দিন ভালো থাকে।
জলপাই-আমলকীর মিশ্র আচার
জলপাইয়ের সঙ্গে আমলকী মিশিয়ে আচার বানালে স্বাদটা আরও ভিন্ন হয়। আমলকীতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে, তাই এই আচার স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। জলপাই আর আমলকী সমান পরিমাণে নিয়ে একই নিয়মে আচার বানাতে পারেন। আমলকী দেওয়ার আগে সেটা হালকা সেদ্ধ করে নিলে ভালো হয়।
জলপাই আচার বানানোর সময় সাধারণ ভুল
অনেকেই আচার বানানোর সময় কিছু সাধারণ ভুল করে ফেলেন, যার ফলে আচার নষ্ট হয়ে যায় বা স্বাদ ভালো হয় না। এই ভুলগুলো জেনে রাখলে আপনার আচার সবসময় ভালো হবে।
- ভেজা বয়ামে আচার রাখা: আচার নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভেজা বয়াম। বয়ামে এক ফোঁটা পানি থাকলেও আচারে ছত্রাক ধরে যায়। বয়াম ধুয়ে রোদে ভালো করে শুকিয়ে নিন।
- ভেজা চামচে আচার তোলা: অনেকেই ভাতের চামচ দিয়ে আচার তোলেন। ভাতের চামচে পানি থাকে, তাই আচার নষ্ট হয়ে যায়। আচারের জন্য আলাদা শুকনো চামচ রাখুন।
- তেলের পরিমাণ কম দেওয়া: আচারের ওপরে তেলের স্তর না থাকলে আচার বাতাসের সংস্পর্শে এসে নষ্ট হয়ে যায়। আচার সবসময় তেলে ডুবিয়ে রাখুন।
- কাঁচা জলপাই ব্যবহার না করা: নরম বা পাকা জলপাই দিয়ে আচার বানালে সেটা বেশিদিন থাকে না। সবসময় শক্ত কাঁচা জলপাই ব্যবহার করুন।
- মসলা না ভেজে দেওয়া: কাঁচা মসলা দিলে আচারে সেই সুগন্ধ আসে না। মসলা হালকা ভেজে গুঁড়া করে নিলে আচারের স্বাদ অনেক বেশি ভালো হয়।
- আচার বানানোর পর সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া: আচার বানানোর পর ৩-৪ দিন অপেক্ষা না করলে মসলা জলপাইয়ের ভেতরে ঢুকতে পারে না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন, স্বাদ অনেক ভালো হবে।
জলপাই আচার নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্ন: জলপাই আচার কতদিন ভালো থাকে?
উত্তর: সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে জলপাই আচার ১ বছর বা তার বেশি সময় ভালো থাকে। কাচের বয়ামে, তেলে ডুবিয়ে আর শুকনো চামচে তুললে আচার সহজে নষ্ট হয় না।
প্রশ্ন: আচারে ছত্রাক ধরলে কী করবো?
উত্তর: ওপরের ছত্রাক ধরা স্তরটা ফেলে দিন। বাকি আচার আবার ভালো করে তেলে ডুবিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রোদে দিন। এরপর পরিষ্কার বয়ামে ভরে রাখুন।
প্রশ্ন: জলপাই আচারে ভিনেগার না দিলে কি চলবে?
উত্তর: চলবে, তবে ভিনেগার দিলে আচার বেশি দিন ভালো থাকে। ভিনেগার না দিলে তেলের পরিমাণ একটু বেশি রাখতে হবে আর নিয়মিত রোদে দিতে হবে।
প্রশ্ন: কাঁচা জলপাইয়ের বদলে পাকা জলপাই দিয়ে আচার বানানো যাবে?
উত্তর: পাকা জলপাই দিয়ে আচার বানানো যায়, তবে সেটা নরম হয়ে যায় আর বেশিদিন থাকে না। কাঁচা জলপাইয়ের আচারই সবচেয়ে ভালো হয়।
আমাদের শেষ কথা
প্রিয় পাঠক, আশা করছি আপনারা সকলে বুঝতে পেরেছেন কীভাবে ঘরে বসে সুস্বাদু জলপাই আচার বানাতে হয়। সঠিক উপকরণ, তাজা মসলা আর ঠিকঠাক সংরক্ষণের নিয়ম মানলে আপনার আচার হবে দোকানের চেয়েও ভালো। শীতের এই সময়টাই জলপাই আচার বানানোর সেরা সময়, তাই দেরি না করে আজই বাজারে গিয়ে তাজা জলপাই কিনে আনুন।
আপনার বানানো আচার কেমন হলো, সেটা আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আর নিয়মিত নতুন রেসিপি আর আপডেট পেতে আমাদের সাইটে চোখ রাখুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সুস্বাদু আচার খেয়ে মজা করুন।

বাংলা আইটিটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url